বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৩

সংস্কৃতি বিনষ্টের বিজ্ঞাপন সমাচার

ইদানিং আমাদের দেশে টিভি ও বিলবোর্ডগুলিতে যে ধরনের বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে সেটা দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটা কিসের বিজ্ঞাপন! এতো অশ্লীল এবং কুরুচিপূর্ণ নির্মাতা ও বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানিগুলো আবার যদি হয় স্বনামধন্য তবে লজ্জায় কি বলার থাকে? মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে দিয়ে গেলে দেখা যায় বেশ কয়েকটা স্থির বিজ্ঞাপনের বিল বোর্ড। যেটা ছেলেদের সেভিং ফোমের। কিন্তু এতে মডেলরা যেভাবে নিজেদের তুলে ধরেছেন এতে বোঝাই যায়না যদি না অনুবিক্ষণ যন্ত্র দিয়ে নিচের দিকে তাকানো না হয় যে, এটা কিসের বিজ্ঞাপন কোন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন। বনানী রেল ক্রসিংয়ের আছে আমাদের দেশের সব চেয়ে বিখ্যাত তাঁতের তৈরি কাপড়ের দোকানের বিজ্ঞাপন যেখানে মডেলের পড়নে কাপড়ই নাই!
এ ধরনের বিজ্ঞাপনে পথচারী কিংবা সারা দুনিয়ায় আমাদের দেশের নারীদের কীসের প্রতীকীতে তুলে ধরা হয়? শুধু কি তাই ? রীতিমত হিমশিম খেতে হয় মাঝে মাঝে সন্তানদের কাছে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে! আমাকে বেশ কয়েকবার এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে আমার সন্তানের কাছে। এটা যদি মেয়েদের জামার দোকানের বিজ্ঞাপন হয় তবে তুমি ওই দোকান থেকে জামা কিনতে পারবেনা। ওদের জামা পরলে আম্মু তোমার শরীর দেখা যাবে। এবং আমি একদিন আমার সন্তানকে দিয়ে একটি বড় ধরনের দোকানে গিয়ে একটি শাড়ি পছন্দ করেছি। ডলের গায়ে সাজিয়ে রাখা ছিল। কিন্তু আমার সন্তান কিছুতেই ওই শাড়ি কিনতে দিলনা। বলল, ওই শাড়ি তুমি কিনবেনা। দেখনা কি বাজে করে এই শাড়ি পরতে হয়? আমি হেসে বললাম বাবা আমি ওভাবে পড়ব না। আমি তোমার নানু দাদুর মত করে পড়ব। তারপরও সে রাজি হল না।
এটা সত্যি লজ্জাকর যে, একটি পন্যের বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে শরীর সর্বস্ব বিজ্ঞাপনে রুপান্তর করে অপ-সংস্কৃতিতে সমাজটাকে ছেয়ে ফেলা হচ্ছে। গয়নার বিজ্ঞাপন দিতে গেলে শুধু গয়নার শিল্পীত প্রকাশটি দেখা যাবে, কিন্তু এখন গয়নার সাথে মডেলের খালি গা? একটি AFTER SHAVE এর বিজ্ঞাপনে নারী মডেলের বেশি লাফালাফি সর্বস্ব। শেষে একটা লাইন, এটা অমুক আপনিও ব্যবহার করুন!
বিজ্ঞাপন প্রচার ও বানানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সচেতনতা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে । আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আমলারা দেশের স্বার্থে এই বিষয়গুলি কেন গুত্বপূর্ণ করে দেখেন না তা নাগরিক হিসেবে বোধগম্য হয় না। তাদের আসলে কাজই বা কী সেটাও হিসাবে মেলে না। কেন সব কিছুর জন্য প্রতিবাদ করতে হবে? সমাজ জীবনে তালগোল পাকানো নোংরামি থেকে আমাদের মুক্ত করতে হবেই।

হরতাল কেন এবং কাদের জন্য?

১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজিনীতি কিছু কিছু বুঝতে শুরু করেছি। মনে পড়ছে ১৯৯০ সাল ২০১৩ পর্যন্ত বিগত ২৩ বছর যাবত একটা ব্যাপার সব সময় করে আসছে সরকারের বিরোধী দলে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো! কিছু একটা হলেই হরতাল অবরোধ। কিন্তু কেন? দাবি আদায় কিংবা আইন ভঙ্গ কিংবা যে কোনো প্রতিবাদের প্রকাশ ভঙ্গিটা কি বদলানর সময় আমাদের এখনও আসে নাই? আজ সপ্তাহের শেষ দিন। ৫ টা কর্ম দিবসের ৪ দিনই হরতালে কাটল! এতে দেশের জনজীবন ও অর্থনীতিতে কি পরিমান বিরূপ প্রভাব পড়তেছে ও পড়ছে? সেটা ব্যবসায়ি মহল কেবল ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে সেটা নয়। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ!
প্রতিদিন ককটেল, যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস আসা যাওয়া করতে হচ্ছে। অফিস না করলেও যে হবে না। কারন, সকল কর্ম দিবস তো হরতাল দিয়ে মোড়ক করা। যেভাবে পার আসতেই হবে। আমরা লিমিটেড কোম্পানিতে কাজ করি। কাজে না আসলে তো চাকুরিও থাকবে না অথবা বড় স্যার বেতন কর্তন করবে।
হরতালের সুফল দিক কি আছে? নাকি ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ছাড়া আর কোন উপকার হয় দেশ ও আমাদের মতো সাধারন জনগনের ? দোকানপাট বন্ধ, স্কুল কলেজ বন্ধ, গাড়ী চলাচল বন্ধ, যানবাহন পোড়ানোয় ব্যস্ত , রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সমভাবে। তবে লাভবান হচ্ছে কে এবং কারা?
কাদের জন্য হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও রাজনীতিতে আমরা যুগ যুগ ধরে লিপ্ত? এ প্রশ্ন আমরা কাকে করব। হরতাল আহ্বানকারিরা জনগনকে জিম্মি করছে, হরতাল বিরোধীরাও জিম্মি করছে। এত আইন হয় হরতাল বন্ধ করার আইন করার সিদ্ধান্ত নেয়া ও বাস্তবায়ন কবে হবে? আদৌ কি হবে ?

এই মহানগরীর একজন নারী যোদ্ধার জীবন গল্প!

রেজা সাহেব একজন সরকারী প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তা ছিলেন। তার জীবন সঙ্গিনী ৭০ দশকের  উচ্চশিক্ষিতা। তারা ৫ কন্যা ও ০১ পুত্রের জনক জননী। যদিও দ্বিতীয় কন্যাটি মারা গেছে ১৯৯৮ সালে ২৫ বছর বয়সে। রেজা সাহেবও বেঁচে নেই। মেয়েদের মধ্যে এবং সন্তানদের মধ্যেও চতুর্থ হলাম আমি। হ্যাঁ আমি আমাকে নিয়ে বলছি আজ। আমার জীবনের উপর দিয়া বয়ে যাওয়া ঘটনা গুলোর একটা অতি বাস্তব দৃশ্য। পড়াশুনায় বরাবর ভাল ছিলাম। ভাল ফলাফলও করেছি প্রতিবার। বাবার সংসারে ৮/১০ মেয়ের মত নয়, লড়েছি ছেলের মতো করে। জমি চাষ, মাছ ধরা, বাজার করা সব নিজ হাতে হাল ধরেছি। প্রচণ্ড দুষ্ট, মারকুটে ডানপিটে ও ছিলাম আমি।
কিভাবে কিভাবে কেমন করে যেন একদিন এসে অনুভব করলাম বাবা মায়ের ছায়া ভালবাসা আমার পাশে নেই। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে যখন গ্রাম থেকে ঢাকা আসব বড় আপা আমাকে বলে দিল বাসে ওঠে বাইরের সাইন বোর্ড দেখতে দেখতে এলাকা চিনে নিবি। ১৯৯৪ সাল, একা একা বাসে করে চলে এলাম ঢাকা। একটি মাত্র কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। ভর্তি হবার সুযোগও পেলাম। পড়াশুনা শুরু হল। কিন্তু হোস্টেল একমাত্র আমি ছিলাম যাকে কেউ কখনো দেখতে আসতো না। কেবল কলেজ ছুটি হলে আমার মেঝ খালা আমাকে বের করে দিতেন। আবার কখনো মিথ্যে অভিভাবক দিয়ে বের হয়ে বাড়ি যেতাম। পুরো কলেজ জীবনে আব্বা আমাকে হাত খরচ দিতে খুব হিসাব করত। কেবল আমার বেলায়। মেধা তালিকায়  চতুর্থ হয়ে কলেজ পাশ দিলাম। আব্বার সরাসরি আদেশ আমাকে আর পড়াশুনা করাতে পারবে না। কারন ততদিনে আব্বা সরকারী চাকুরি থেকে অবসর গ্রহন করেছেন। কিন্তু আমার আব্বা ঠিকই আমার ছোট দুই ভাই বোন পড়াশুনা করাল। তাতে কি! আমিও খুঁজে নিলাম চাকুরী। বেশ ভাল একটা চাকুরী পেলাম। আস্তে আস্তে ছোট দুই ভাই বোনকে নিজের কাছে ঢাকার বাসায় নিয়া আসলাম। আসলো আমার বড় বোন। আসলো আমার মেঝ বোন। আমি আমার আব্বার বাকি ৪ সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে নিলাম। একে একে বড় আপা বিয়ে করে সুদুর আমেরিকা পাড়ি জমাল। মেঝ বোন পড়াশুনা শেষ করে নিজের স্বামী সন্তান নিয়ে থাকা শুরু করলো ঢাকার বাইরে !
পুরো ঢাকা শহরে আমি একা চড়ে বেড়িয়েছি। চাকুরী করেছি তখন আমার বয়স মাত্র ১৮। আমি আমার বাবার ছেলের দায়িত্ব পালন করেছি। আমার আব্বা একটা সময় এসে তো বলত আমি নাকি তার ছেলে! আমাদের গ্রামের সবাই আমাকে দেখলেই বলত ”তুই বেঁচে থাক” তুই যা করলি তোর বাবার জন্য এটা মেয়ে তো দূরে থাক ছেলেরাও করেনা।
আমার মা বাবা আমার প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা ভুল করে থাকলেও তাদের উপর কখনো রাগ কাজ করেনি। অভিমান করে মাঝে মাঝে কাঁদতাম আর বলতাম আমাকে কেন তোমরা পড়াশুনা করতে দিলা না। কেন তোমরা তোমাদের অপারগতা প্রকাশ করলে কেবল আমার বেলায়? আমার ছোট ভাই বোন দুটুকেও তোমরা ঠিকই পড়াশুনা করিয়ে শেষ করলা।
ছোট দুই ভাই বোনকে সাথে করে নিয়ে আমিও বিয়ে করলাম আমার ছোট বেলার বন্ধুকে। আমরা একে অপরকে চিনি জানি সেই ক্লাস সিক্স থেকে। যখন বিয়ে করলাম সে তখনও ছাত্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজ পরছে। চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয়ার পর আমার বন্ধুটি তার বড় দুই ভাইকে রেখেই আমাকে বিয়ে করে ফেললো ! শুরু হলো অপমান, মানসিক অত্যাচারের, অসন্মানের আরও একটা অধ্যায়।
আমার স্বামী মানুষটি পরিবারের সব চেয়ে ছোট ছেলে এবং দুই ভাইকে টপকে বিয়ে করেছে তাই সে চাইলেও অনেক কিছু বলতে পারে নাই করতে পারেনাই। তবে আমার পাশে ছিল বলেই আমি আজ দাঁড়িয়ে আছি। আমার বাবার অনেক সম্পদ নাই, আমি দেখতেও সুশ্রী নই, উচ্চ শিক্ষিতা নই- এই তিনটি যুক্তি ছিল ওদের কাছে অনেক বড়! আমাকে মেনে নেয়নি আজও! আর কখনোই মেনে নিবে না, সেটাও জানি! আমার স্বামীকে আমার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন বলেছিল তুই এই মেয়েকে বিয়ে করেছিস? তোর ভবিষ্যৎ বলে কিছু আর থাকলো না! কেবল একজন এমবিবিএস ডাক্তার হয়েই থাকবি ।
কিন্তু আমার জীবনে বাজী হিসেবে নিয়েছিলাম। স্বামীকে বলেছিলাম বন্ধু আমার দিক থেকে যা যা সাহায্য লাগে বল আমি তোমাকে দিব। তুমি এক লাফে সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হও এটাই আমার একমাত্র চাওয়া। সম্পদ, গাড়ি, বাড়ি, অলঙ্কার চাইনা। চাই তোমাকে একজন সফল ডাক্তার হিসাবে দেখতে। আল্লাহ সহায় আমার স্বামী একটি পরিক্ষাও দ্বিতীয়বার দিতে হয়নি। এফসিপিএস পার্ট- ০১ এক বারেই পাশ করলো। বিসি স একবারেই উত্তীর্ণ হলো। এফসিপিএস চূড়ান্ত পরীক্ষাটাও একবারেই পাশ করে গেল। যারা ডাক্তারদের সম্পর্কে জানেন তারা বুঝবেন মেডিসিন হোক কিংবা যে কোনো বিষয়ে একবারে এফসিপিএস-এর মতো পরীক্ষা পাশ প্রায় বিরল। আমার স্বামীকে আমি কিছু নিয়ে ভাবতে দেইনি। ওর জুতা থেকে শার্ট সব আমি একা একা কিনতাম। টাকা পয়সার জোগান দিতাম।
আমি একটি মেয়ে যে কিনা কখনো গয়না কিনি নি, একটা ভাল শাড়ি কেনার শখ হয়নি। আমার জীবনে একটাই শখ ছিল আছে সেটা হলো আমার স্বামী একজন নামকরা ডাক্তার হবে। আমার সন্তানটি তার বাবাকেই অনুসরণ করবে।
দুঃখকর অধ্যায়টা হলো আমার স্বামী নিজেকে নিয়ে এত বেশি মত্ত ছিল যে, বউ ছেলের দিকে ফিরেও তাকায় নি। আমি অনেকবার আবদার করেছিলাম আমি আবার পড়াশুনা শুরু করতে চাই। পরতে চাই। আমার অসমাপ্ত পড়াশুনাটা আবার শুরু করতে চাই। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে সাফ জানিয়ে দিল। তুমি পারবা না! তোমার পক্ষে এই বয়সে এসে পড়াশুনা করা সম্ভব না! অনেক অনুনয় বিনয় করে কেঁদে কেটে রাজি করাতে ব্যার্থ হয়ে অসফল হয়েছি সত্যি, তবুও আমি থেমে থাকিনি।
একদিন ঢাকা শহরের সকল বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়গুলোয় খোঁজ নিলাম। চাকরী করার পাশাপাশি আমি কি করে আমার স্নাতক ডিগ্রিটা সমাপ্ত করব? একজন সহকর্মীকে সহায়তায় খুঁজে পেলাম। তিনিও ওই বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্র। আমি ভর্তি হয়ে গেলাম। সংসার, অফিস, পড়াশুনা সব মিলেই আমি হাঁপিয়ে উঠছিলাম, পারছিলাম না। আমার স্বামী আমাকে আটকে রাখেনি তখন। তবে সাহায্যও করেনি। আমার এক বড় ভাই আমাকে সাহায্য করেছে। যার মূল্য আমি কখনো দিতে পারব না। উনি আমাকে সাহস যোগায়ে দিয়েছেন। বলতেন তুমি এগিয়ে যাও তুমি পারবে আটকাবেনা। আমি আসলেই আটকাই নাই। তবে ক্লান্ত হয়েছি। মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে মনে হতো নাহ্‌ ছেড়ে দেই পড়াশুনা!
আমার সঙ্গে যারা পড়াশুনা করছে তাদের মধ্যে মাত্র তিন জন নারী ছিলাম, বাকি ৩৫ জন ছিল পুরুষ। সব মেয়েগুলোই আস্তে আস্তে চলে গেল। রইলাম আমি একজন নারী আর ২০/২৫ জনের এক দল ছেলে ছাত্র। যাদের মধ্যে আমাকে খুব বেশী সহযোগিতা করেছে কয়েকজন। যাদের বয়স আমার বয়সের ঠিক অর্ধেক। মাঝে মাঝে ওদের সাথে মজা করতাম যে, আমি তো তোমাদের মায়ের বয়সী । আমার শিক্ষকরাও বেশিরভাগ আমার থেকে বয়সে ছোট! কয়েকজন শিক্ষক তো আমাকে দেখে অবাক হয়েছেন। বলেছেন আপনাকে দেখে অগ্নিশিখার মতো মনে হয়! আমার বিশ্ববিদ্যালয়য়ের বাকি ছাত্র-ছাত্রীরাও আমাকে দেখে অবাক হতো, আর বলতো আপা এই বয়সে আপনি কেন এত কষ্ট করছেন? কি দরকার? স্বামী ডাক্তার শুনলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় সবার। পড়াশুনা কি কেবল চাকরী আর বিয়ে করার জন্য? আমি যেই চাকরিটা এখন করছি সেটা আজও অনেক ভাল চাকরি। নতুন ডিগ্রি চাকরিক্ষেত্রে কাজে না লাগলেও আমার মনের জোর বাড়িয়ে দিল অনেক খানি।
আমার পরাশুনার আগ্রহ ও পরীক্ষার ফলাফলে আমার স্বামী সন্তুষ্ট এবং একটা সময় আমাকে সাহস যোগাতে শুরু করলো। একদিন হুট করে এটাও বলল, তোমাকে আমি বিদেশ থেকে পড়াশুনা করায়ে আনব। আর মাত্র ক’মাস পর আমি একজন পুরকৌশলী হব ইনশাল্ললাহ! আগামি বছর ইনশাল্লাহ মাস্টার্সটাও শুরু করে দিব। আমি আমার স্বামীকে গতকাল রাগ করে বললাম, আমি পাশ করার পর সনদপত্রের ফটো কপি করে তুমি সত্যায়িত করবা। এবং যারা যারা আমাকে আমার শিক্ষা নিয়ে অপমান, মানসিক নির্যাতন করেছে তাদের গিয়ে বলবা এই নেন আমার বউয়ের এর স্নাতক সম্পন্ন করার সনদের কপি। যেটা আমি সত্যায়িত করেছি। ও পাশে ছিল বলেই আমি বিসিএস পাশ করে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। আমার বউ আমার তো নয়ই অন্য কারও কখনো বোঝা হয়নি। উল্টো সবার উপরে উঠার সিঁড়ি হয়েছিল। একটা সনদপত্রের জন্য আমি যে কি পরিমান লাঞ্চিত অপমানিত হয়েছি সেটা আমি জানি।
আব্বা বেঁচে নেই। আম্মা দেশে নেই। আম্মা আছেন বড় বোনের কাছে আমেরিকা। আমার ছোট দুই ভাই বোন এখনো আমার কাছে আমার পাশে বাস করে।
আমি নিজেকে নিজে সফল করেছি। আমার চারপাশ এখন অনেক গুছানো পরিপাটি হয়ে আসছে। কিন্তু ততদিনে যে আমার সময় হয়ে গেছে চুলে কালো রঙ করার আর পুরানো দাঁত ফেলে দিয়ে কৃত্রিম দাঁত লাগানোর। অনেক কিছুই বদলালো। কেবল বদলালো না আমার শ্বশুর বাড়ীর মানুষগুলো। এটা আমার স্বামী, বন্ধু অপুও স্বীকার করে। অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। কি করবে ওর মা বোন ভাই বলে কথা! কিন্তু তাতে কি! আমার স্বামীতো আমার পাশে আছে। আছে আমার সাহস। আমি কর্মঠ। আমি ভীত নই। আমি থামবো না।
তারপরও আমি সুখী, খুশী। অবশেষে আমি সফল। এখন আমি সকলের গর্ব। অনেকের আদর্শ।
অনেক ধন্যবাদ আমার বাল্য বন্ধু আমার সন্তানের পিতা আমার ভালোবাসার মানুষ ডাক্তার অপু’কে। আমার স্বামীর মনোভাব উদার না হলে, আমাকে এত বড় একটা সুযোগ না দিলে, আমি এতগুলো ছেলের মাঝে একমাত্র মেয়ে হলে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে কখনোই পারতাম না। আমার স্বামী একজন আদর্শ স্বামী একজন আদর্শ ডাক্তারও বটে। আমাদের দেশে মেয়েদের এত স্বাধীনতা দেয় কয়জন স্বামী? তবে আমার স্বামী আমাকে পুরো  স্বাধীনতাটাই দিয়েছিল। আমার অপু আমাকে কথা দিয়েছে আমাকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করাবে। আমার ছোট বোন মুন, আমার আম্মা, আমার ছোট ভাই, আমার ক্লাসের সকল ছোট ছোট ছেলেগুলোকে বিশেষ ধন্যবাদ। পল্লব ভাই আপনাকে, আপনি আমাকে বলেছিলেন সুধা তুমি পারবে। ভয় পেও না পিছিয়ে যেও না। কষ্ট করে শেষ কর পড়াশুনাটা। একদিন তুমি তোমাকে অনেক শক্ত, অনেক সন্মানীয় করে তুলতে পারবা যারা তোমাকে অপমান করেছে অসন্মান করেছে। তুমি কারও বোঝাও না দায়িত্বও না। তোমাকে দেখে অন্যরা শিখবে।  ভাইয়া আপনি আমাকে একটা নতুন আলোর জগতে আসার অসীম সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছেন। আপনার কথাগুলো আমি কখনো ভুলিনি ভুলব না। আপনি আমার বড় ভাইয়ের মতো, আমাকে দূর থেকে যেভাবে সাহায্য করেছেন সেটা অবর্ণনীয়।
বিশ্ব নারী দিবসে আমি আমার সংগ্রামী জীবনের ঘটে যাওয়া, বয়ে যাওয়া অধ্যায়গুলো থেকে একটু বললাম। নারীদের সাহস যোগাতে। নারীদের পাশে এসে দাঁড়াতে। আমি কাজ ভালবাসি, আমি মানুষ ভালোবাসি। আমি দেশ ভালোবাসি। আমি সকলকে শ্রদ্ধা করতে পারি। আমি দুর্বলকে টেনে তুলি, সবলকে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যম যোগান দেই। নারী বলে নিজেকে গুঁটিয়ে না রেখে বাইরে বের করে আনা প্রতিটি নারীর নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার এবং নিজেদের একটা জগত তৈরি করা দরকার।
আমি সব সময় বলি, বলতে ভালোবাসি : MY DAILY LIFE IS NOT CAREER….IT IS MY LIFE STYLE…..
আমি একজন সফল নারী। সফলতা সকল ক্ষেত্রেই আজ আমার। এখন একটাই লক্ষ্য একজন সফল মা হতে চাই। সন্তানকে প্রতিদিন এটাই দেয়ার চেষ্টা করছি। এই নিরব সফল যোদ্ধা যেন জীবনের এই যুদ্ধেও সফল হই সেজন্যে সকলের দোয়া, সহযোগিতা, উপদেশ কামনা করছি !
আমিও পেরেছি সকলেই পারবে। নারী দিবসে সকলে অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল।

১৫’ x ৮’ জায়গা দখল করে একজনের চলেফেরা পিক ট্রাফিকের সময় মানা যায় না

সকালে যখন অফিস আসি তখন রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয়না যে আমরা দরিদ্র দেশে বাস করি কিংবা আমাদের কেন উন্নয়নশীল দেশ বলা হয়। যতদূর চোখ যায় শুধু প্রাইভেট কার সারি সারি! মাঝে চাপা পরে হাতে গুনা কয়েকটা পাবলিক যানবাহন। একটা বাস রাস্তায় যতটুকু জায়গা দখল করে তার থেকে কয়েক শ গুন বেশি যাত্রী বহন করে। উল্টো দিকে একটি প্রাইভেট গাড়ী যতটুকু জায়গা দখল করে যাত্রী বহন করে ১ থেকে ২ জন বড়জোর ৪ জন। ফলে রাস্তায় বেরে যায় বিশাল যানজট। সেটা সকাল বেলা অফিস আসার সময় ও বিকেলে বাসায় ফিরের পথে সকলেই টের পাই।
আমাদের দেশের যানজট দূর করার জন্য পিক সময়ে গাড়ী চলাচলে একটা বিশেষ আইন থাকা দরকার। নইলে যেই হারে প্রাইভেট গাড়ী বাড়ছে আর কিছুদিন পর রাস্তায় গাড়ী তো চলবেই না দেখা যাবে গাড়ির উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরে যাচ্ছি। এখনই তো মাঝে মাঝে গাড়ী থেকে নেমে গাড়ির আগে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছা যায়।
একটা রাস্তায় যে পরিমান গাড়ী চলাচলের ক্ষমতা রেখে নক্সা ও পরিকল্পনা করে হয়েছিলো এখন তার থেকে কয়েক গুন গাড়ী বেরে গেছে। কিন্তু ধারন ক্ষমতা বাড়েনি বাড়ানো হয়নি। সেখানে গাড়ী চলাচলে সময়, নিয়ম থাকা দরকার। অফিস সময়ে ও ছুটির সময়ে পাবলিক গাড়ী ছাড়া প্রাইভেট গাড়ী রাস্তায় বের হলে একটা চার্জ সরকার কে দিতে হবে। কিংবা কিছু রাস্তা থাকবে যেটা কেবল চার্জ দিয়ে চলাচলের জন্য রাখা হয় । যাত্রীদেরকে পাবলিক গাড়ীতে চলাচলের সুবিধা সহ সহজলভ্য করে দিতে হবে।
সব রাস্তা দিয়ে যেমন সবসময় রিক্সা চালান যায় না। ঠিক তেমনি সকল গাড়ী চলাচলেও একটি নিয়ম নিতি করা দরাকার। শুধু রিক্সা কেন সকল গাড়ির চলাচলে নিয়ন্ত্রন করলে যানজট অবশ্যই কমবে।
রাস্তা ফাঁকা থাকলে যে পথটা ২০ মিনিটে আসা যাওয়া করা যায় ঠিক সেই রাস্তায় যানজট লেগে থাকে দুই ঘণ্টায়ও পারাপার হওয়া যায় না। এটা আমরা যারা পাবলিক গাড়ীতে চলাচল করে অফিসে আসা যাওয়া করি তারা খুব ভাল করে রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পাই। শুধুমাত্র সময় মত অফিসে পৌঁছার জন্য অফিসের বেশ নিকটে থেকেও কিংবা যতটুকু সময় লাগার কথা তার থেকে বেশি সময় গাড়ীর তেল ফুরিয়ে সময় নষ্ট করে ঝিমানো ছাড়া আর ঘড়ি দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকেনা।
এভাবেই আমাদের অনেক মূল্যবান সময় জীবন থেকে প্রতিদিন শেষ হয়ে যাচ্ছে । আমরা যারা কাজ করি, আমাদের কাজের বিনিময়ে দেশের উন্নতি হয় হচ্ছে হবে তারাই পঙ্গু হয়ে বসে ঝিমানো ছাড়া কিছুই করার থাকেনা !

প্রিয় নেতাজী, ফিরে তাকান একটু!

প্রতিদিন সকালে অনেক লম্বা একটা মানুষের লাইন পেরিয়ে বাসে করে অফিস আসি। লম্বা লাইনের মুখোমুখি হই একটাই কারন, একটি খালি আসন পাওয়ার যুদ্ধ! তাই একটু ভোর বেলায়ই বের হই। যথারীতি বাসে উঠে আসন গ্রহন করলাম। নির্ধারিত ১১ টি মহিলা শিশু ও প্রতিবন্দী আসন থাকাতে অনেক মহিলাকেই প্রতিদিন দাঁড়িয়ে ঝুলে চলাচল করতে হয়!
সন্তান কিংবা বাচ্চাদেরকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যারা ভিক্ষা বৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ঠিক এমনি একজন মা মেয়ে বাস উঠলেন। মেয়েটাকে বয়স ৯/১০ বছর হবে। মায়ের কোলে মেয়েটি খুব জ্বালাচ্ছে, কাঁদছে। তাকিয়ে দেখি একটি চোখ নেই। ভাবলাম মা বুঝি অন্ধ মেয়েটিকে দেখিয়ে ভিক্ষা চাওয়া শুরু করবেন। না ভিক্ষা চাচ্ছেন না । মেয়েটি কেঁদেই চলেছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম মেয়েটির অন্ধ চোখটি ক্ষত এবং বা হাতে একটি কেনলা লাগানো। (উল্লেখ্য কেনলা হল লম্বা সময় ইঞ্জেকশান কিংবা স্যালাইন দিতে গেলে যেই ব্যবস্থা নেয়া হয়)। বুকটা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। হুড়মুড় করে নিজের আসনটি ছেড়ে দিলাম মা মেয়েকে। দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে জানতে পারলামঁএবং দেখতেও পেলাম মেয়েটির অন্য চোখটি ভাল আছে এবং বা চোখে ক্যান্সার হয়েছে ! মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে কেমোথেরাপি দিতে। অনেকদিন কেমোথেরাপি দিতে পারেনি দুইটা কারনে।
০১. টাকা পয়সার সমস্যা
০২. হরতালে কি করে আসবে এই মা মেয়েকে নিয়া ?
জিজ্ঞেস করলাম কি অবস্থা শরীরের? বললো, আজ ডাক্তার বলে দিবে ক্যান্সার কি পুরু শরীরে ছড়ায়ে গেছে কিনা! যদি ছড়ায়ে যায় তাইলে …..আর বলতে পারলনা। দুই চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়তে শুরু করল। অস্থির হয়ে গেলাম মায়ের চোখের জল দেখে। পরক্ষনেই মা আবার স্বাভাবিক হয়ে মেয়েকে নিয়া ব্যস্ত হয়ে গেলেন। মেয়েটা যে কি জ্বালাচ্ছে মাকে সেটা আমি একজন মা হয়ে সহ্য করতে পারছিলাম না খুব রাগ হচ্ছিলো ক্ষোভ হচ্ছিলো। কিভাবে চিকিৎসার খরচ জোগান দিচ্ছেন? MADAM দেয়! একটু স্বস্তি পেলাম কি করবো আমি? কি করতে পারি এই মেয়েটার জন্য? আমার কতটুকু সামর্থ্যই বা আছে? আমরা তো ব্যস্ত নগরীর যান্ত্রিক মানুষ! এটাও বুঝলাম মেয়েটা আসলে আর…..! তাইলে ওর কিছু ইচ্ছা শখ পূর্ণ করতে কি পারি আমি? মাকে জিজ্ঞাসা করলাম কি খায় কিছু কি চায়? মা আবার চোখের জল ফেলেই গেলে। না রে আপা আমার মেয়েটার কিছুই চাওয়ার নাই ! তারপর ও ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা বের করে দিলাম। বললাম ওর ইচ্ছা হয় যা সেটা কইরেন এই টাকাটা দিয়ে। আমার পাশে বসা ছিল যেই মেয়েটি সে এখন ওই মা মেয়ের পাশে বসে আছেন এখনো। উনি ১০০০ টাকা দিলেন।
মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতাল আসলো মা মেয়ে নেমে গেল। আপা আসি।
যতক্ষণ দেখা যায় পিছন ফিরে তাকিয়ে রইলাম ওদের পানে। হয়তো আর কোনোদিন কখনোই মা মেয়ের দেখা মিলবে না। এই ছোট মেয়েটি আমার মতো বড় হয়ে মা হতে পারবেনা ! ওর জীবনটা ৯/১০ বছরেই থেমে গেল। হে আল্লাহ তুমি কেন এমন কষ্ট দাও আমাদের? এত কঠিন পরীক্ষায় কেন ফেল আমাদের? এই নিস্পাপ মেয়েটির কি অন্যায়ের শাস্তি তুমি তাকে এই বয়সেই দিয়ে দিলে ? ও তো এখনো নিস্পাপ ।
বাস থেকে নামার সময় টের পেলাম আমার হাত পা কাঁপছে যেটা এখনো বর্তমান। মেয়েটির চিৎকার আমার কানে বেজে উঠছে। মনে হচ্ছে আমার সন্তানটি আমাকে ডাকছে!
আজ আমার খুব কষ্ট হল এই ছোট মেয়েটির অকাল ঝড়ে যাওয়ার গল্পটি শুনে ও দেখে। ওর পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সমাজে। আজ যেই মেয়েটির মা দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার মেয়ের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে এটা কি তার নৈতিক অধিকার না? একটু সুচিকিৎসা, একটা ভালো সুন্দর জীবন এই মেয়েটি এবং মেয়েটির মায়ের কি গণতান্ত্রিক অধিকারে পড়েনা? তাহলে কেন আজ ঘরে ঘরে খোঁজ নাই তাদের? নির্বাচনী ভোট চাইতে তো প্রতিনিধিরা ঠিকই দ্বারে দ্বারে যেতে পারেন। বুকে জড়িয়ে ধরতেও ঘেন্না লাগেনা।
আমাদের দেশ প্রিয় বুদ্ধিজীবীদের কাছে হাত জোর, নেতাদের অনুরধ করবো, দয়া করে প্রতিমাসে না পারেন ৩ মাসে একবার করে সকলের খোঁজ নিন! আপনি শুধু আপনার নির্বাচনী এলেকার লোকদের খোঁজ নিন। একটু পিছনে ফিরে তাকান। আমরা তো আপনাদেরই একজন। রাজার নীতি নয় রাজনীতি সকলের মঙ্গলের জন্য এমন কিছু করুন যাতে সকলেই হাঁসতে পারে। একটু তাকান আমাদের দিকে। খোঁজ নিন ফিরে তাকান !

অন লাইন পত্রিকাগুলোতে নোংরা মন্তব্যে ভরপুর! কিন্তু কেন?

আমাদের দেশে আমরা এখন অনেক সহজেই ঘরে বসে রাস্তায় চলাচল অবস্থায়  প্রায় সব রকমের দৈনিক পত্রিকা পড়তে পারি অন লাইনে! সেটার পাঠক শুধু দেশে নয়, দেশে ছাড়িয়ে বর্হিবিশ্বেও আসছে! আমিও মোটামুটি একজন দৈনিক পাঠক! পত্রিকাগুলোর বেস কয়েকটায় আবার কোন খবরের উপর পাঠক কমেন্ট করার সুযোগ পায়! অদ্ভুত হচ্ছে এক শ্রেণীর পাঠক যাচ্ছেতাই ভাষায় গালি গালাজ কিংবা কটু উক্তি দিয়ে একটা কমেন্ট করে! মাঝে মাঝে কেন বেশির ভাগ চলমান খবরের পাতাগুলুতেই এত নোংরা ভাষা ব্যাবহার করা হয় সেই দিকে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের মনে হয় কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। পত্রিকার নিউজে নীচের কমেন্টগুলো পড়লেই বুঝা যায় আমাদের মস্তিষ্ক কতটা বিকৃত ও অসুস্থ।
আশা করছি সকল পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় এই দিকটিতে নজরজরদারি করবেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এছাড়া যারা এই ধরনের আজে বাজে কথা উক্তি/ মন্তব্য করবেন তাদের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ চাই।
আমি কারও পক্ষ বিপক্ষের জন্য বলছিনা। শুধু সেইসব শিক্ষিত সচেতন মন্তব্যকারিদের বলতে ইচ্ছা করে ব্যক্তিগত মতামত এত নোংরাভাবে না বললেই কি হয় না?

আম্মু পদ্মা সেতু বানায় না কেন সরকার? মেঘনা সেতু ভাঙল কি করে?

হাসিন, বয়স ৭+, ক্লাস টু তে পড়ে। এ বয়সী ছেলে মেয়েগুলো এমনিতেই অনেক কৌতুহুলি হয়। এমন একজন হাসিন। গত মাসে রাজশাহী থেকে বেড়িয়ে আসলাম। প্রথম বারের মতো বঙ্গবন্ধু সেতু দেখার সুযোগ, একসাথে মা ছেলেসহ পুরো পরিবার পেলাম। এত বড় ব্রিজ! আম্মু আমাদের দেশে আর কয়টা বড় ব্রিজ আছে? বললাম যে কয়টা মনে পরল তখন ।
হুট করে আমাকে আমাকে প্রশ্ন করল পদ্মা নদীতে কোনো ব্রিজ নাই ?
- না বাবা নাই!
কেন নাই?
- তৈরি করা হয়নাই!

কেন তৈরি করা হচ্ছেনা?

- হবে বাবা হবে ?
কিন্তু কবে? এখনও হচ্ছেনা কেন?
বাধ্য হয়ে বললাম বাবা সরকার চেষ্টা করছে ব্রিজ বানাতে। অনেক বড় ব্রিজ তো অনেক টাকা লাগবে, সে জন্য দেরি হচ্ছে।
কেন সরকারের টাকা নাই আম্মু?
- এত টাকা নাই বাবা !
আম্মু তুমি মিথ্যা কথা বলতেছ। সকারের টাকা নাই! হি হি কি বোকা আমার আম্মু!
অনেক বুঝালাম, বললাম সত্যি বাবা। আমরা গরিব দেশ তো, এত টাকা আমাদের নাই! বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ বাবা! আমরা সাহায্য চাচ্ছি। পাচ্ছি না!
কেন পাচ্ছেনা আম্মু?
কি করে বুঝাই দুর্নীতি জড়িয়ে গেছে! কি করে বুঝাই কেন টাকা নাই? কেন বানানো হচ্ছেনা পদ্মা ব্রিজ!
শেষ করে দিলাম বাবা শোনো খুব শীঘ্রই বানাবে! এত প্রশ্ন করোনা বাবা। (বিরক্ত হয়েই গেছি বলা যায়)। যখন বানাবে দেখতে পাবা জানতে পারবা!
কি করে আম্মু? টাকা পাবে কই? বাংলাদেশকে কেন গরীব দেশ বলা হয়? উন্নয়নশীল দেশ কি?
বললাম এমনও হতে পারে আমার বেতন থেকে, তোমার বাবার বেতন, মামার বেতন সবার বেতন থেকে কিছু পরিমান টাকা কেটে রাখবে! তারপর শুনেছি এই আমরা মোবাইল দিয়ে কথা বলি সেখান থেকেও টাকা কেটে রাখবে! বুঝলা বাবা! আমাদের টাকা দিয়ে বড় ব্রিজটা বানানো হলেও হতে পারে! আবার অন্য ভাবেও হতে পারে! আমি জানি না বাবা! তুমি যখন বড় হবা তখন সব বুঝবা!

একটু পর আবার প্রশ্ন, মেঘনা সেতু ভেঙ্গে গেল কেন? এটা কেন মেরামত করতে হচ্ছে? কেন এতদুর ঘুরে বাবাকে কুমিল্লা যেতে হয়? বাবা কি আজো ভাঙ্গা ব্রিজটার উপর দিয়ে গেল? 
হ্যালো বাবা তুমি আর বাসায় ফিরবানা? যেদিন বাবা ওই রাস্তা দিয়ে ঢাকার বাইরে যাবে সেই সে বাবাকে ফোন দিয়া জানতে চাইবে! ভয় পায়! বাবা তুমি যখন ব্রিজের ওপর উঠো তখন কি ব্রিজটা কাঁপতে থাকে? বেশী নড়ে? ভয় পাওনা? ছিদ্র হয়ে গেছে?
হাসিন ব্রিজ মেরামত হচ্ছে! চুপ থাকতো বাবা!
কতদিন লাগবে? আম্মু সত্যি কি মেরামত হচ্ছে? নাকি গাড়িসহ ব্রিজ ভেঙ্গে নদীতে পড়ে যাবে! আম্মু তুমি না ইঞ্জিনিয়ার? তুমি আমাকে বল!
বাবা এত গাড়ি প্রতিদিন চলাচল করে যে ব্রিজের যতটুকু ক্ষমতা ওজন নেয়ার তার থেকে অনেক বেশী নিতে হচ্ছে। যে ইঞ্জিনিয়ার ডিজাইন করেছে তিনি ভাবতেও পারেন নাই আমাদের দেশে এত দ্রুত গাড়ির সংখ্যা বেরে যাবে। বাবা জনসংখ্যার উপর একটা হিসাব। প্রতিদিন রাস্তা দিয়ে কয়টা গাড়ি চলে সেটার একটা জরিপ  করে পড়ে একটা ব্রিজ ডিজাইন করা হয় এবং তাই হয়েছিল! তারপর তো সিমেন্ট, রড, বালি এইসবের ঘাপলা আছেই বাবা!
তখন ছেলে বলে, তাইলে মা চলো আমরা আমেরিকা চলে যাই। নইলে অস্ট্রেলিয়া। যেটা ধনী দেশ। এখানে কেবল হরতাল, যানজট, মারামারি হয়।
নাহ যাবনা! ওখানে গেলে ইংরেজিতে কথা বলতে হবে। আমি বাংলা বলতে ভালবাসি। শুনো, তুমি কিন্তু আমাকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ভর্তি করবেনা। নানা কথা নানা প্রশ্ন।
আমার স্বামী তার ছেলের প্রশ্নের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে শুনল আর বলল এই GENERATION বড় হলে কি হবে দেখলা? সব খুঁটিয়ে বের করবে । অনেক সচেতন! আমার তোমার মতো না। আমার সন্তানের দিকে তাকিয়ে আমিও সত্যি অবাক হই। আবার আতকে উঠি আমাকে আবার ত্বকীর মা হতে হবে নাতো ? কিংবা বিশ্বজিৎ? আমাদের দেশে বেশি সচেতন হওয়া কি ভাল? নিজের প্রশ্নে নিজেই দ্বিধা দ্বন্দ্বে পুড়ে মরি। বড় করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি!
তবুও আশায় বুক বাধি। আমার ছেলে এই দেশের মাটিতে দেশকে ভালোবেসে বড় হোক, দেশের জন্য ওর মেধাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাক। ভাল মানুষ হোক এটাই আমি চাই! সুস্থ জীবন যাপন করুক! একজন গর্বিত নাগরিক হয়ে উঠুক। আমার দেশের রাজনীতি কি ওদের জন্য হয়ে উঠবে না?