১৯ জুলাই ২০১২ সালে আমাদের সকলের প্রিয় ও নন্দিত কথা সাহিত্যিক
হুমায়ুন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে আমেরিকা
থেকে বসে বসে অনেক লেখা পাঠাতেন আমাদের দেশের নানা দৈনিক পত্রিকায়। আমি
সেই সকল লিখা নিজের সংগ্রহে রেখেছি। সেখানে থেকে কিছু কিছু কথা শেয়ার
করলাম। যেখানে হুবুহু স্যারের কথাইগুলুই আমি কেবল কপি করেছি। উনার লেখনির
প্রতি সন্মান জানাতে। আমার মতো এতো নগণ্য একজন মানুষ নিজে থেকে উনাকে নিয়ে
দুই লাইন সাহস পেলাম না।
স্যারের আত্মার শান্তি কামনা করছি! নুহাশ, নিশাদ, নিনিত, নোভা , বিপাশা, শিলা, শাওন এবং গুলতেকিনের জন্য রইল সকলের পক্ষ থেকে সমবেদনা এবং শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বাবার দেয়া নাম শামসুর রহমান কাজল বদলে নিজেই রেখেছেন নিজের নাম হুমায়ুন আহমেদ। আজ ১৯ ২০১৩ সাল জুলাই নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী।
সংসার
এক মানুষ জীবনে কতবার সংসার করে? বেশীরভাগ মানুষের জন্য একবার! ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের কারনে বাংলাদেশী মানুষের জন্য দুবার! প্রথম সংসার পুড়ে জ্বলে পুড়ে যাওয়ার কারনে দ্বিতীয় বার। আমি মনে হয় কথা গুছিয়ে বলতে পারছিনা। এখানে সংসার মানে বিয়ে করে ঘর বাঁধা বুঝাচ্ছিনা! হাড়ি কুড়ি, বিছানা বালিশ নিয়ে দিনযাপন বুজাচ্ছি!
আমার মা অতি অল্প বয়সে বাবার সঙ্গে সংসার করতে এসেছিলেন! বাবার মৃত্যুতে মায়ের সংসার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো! তিনি তার বড় ছেলের সঙ্গে ঢাকায় এলেন! নিউমার্কেট থেকে হাঁড়িকুঁড়ি কিনে নতুন সংসার শুরু করলান। আমি বাবাশুন্য মায়ের নতুন সংসারে যুক্ত হলাম!
পড়াশোনার জন্য আমেরিকায় গেলাম। গুলতেকিনকে নিয়ে শুরু হল তৃতীয় সংসার! হাড়ি পাতিল কেনা, বিছানা – বালিশ কেনা!
ঢাকায় ফিরে এসেই সেই সংসার ভাঙল! উত্তরার এক বাসায় শুরু হল আমার চতুর্থ সংসার। বছর তিনেক পর শাওন আমার সঙ্গে যুক্ত হল দখিন হাওয়ায় আমার পঞ্চম সংসার!
ক্যান্সার বাধিয়ে আমেরিকায় এসে শুরু হল ষষ্ঠ সংসার। সম্ভবত, সপ্তম সংসার হবে আমার শেষ সংসার! সেখানে কি আমি একা থাকবো? নাকি সুখ-দুঃখের সব সাথি-ই থাকবে?
দার্শনিক কথা বার্তা থাক, ষষ্ঠ সংসার নিয়ে বলি! বাড়ি ভাড়া করা হল, হাড়ি পাতিল কেনা হল, টি ভি কেনা, বিছানা-বালিশ – সে এক হইচই। তিন রুমের একটি আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি! বাড়িটা নিশ্চয় সুন্দর। কারন, কথাবার্তার এক পর্যায়ে বাড়িতে রোগী দেখতে আসা প্রধানমন্ত্রী বললেন “বাড়িটা কার? ” আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম যেহেতু ভাড়া নিয়েছি, আপাতত আমার !
নিউইয়র্ক এর নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ – বালিশ
আমার জন্ম জেলা নেত্রকোনা ” বালিশ” নামের এক ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়! আকৃতি বালিশের মতোই! এক বালিশ ৭/৮ জনে মিলে খেতে হতে হয়। ~ নেত্রকোনা শহরের মিষ্টির দোকানে বসে আছি ! ময়রা থালায় করে বালিশ এনে আমার সামনে রাখল। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, একটু মুখে দেন স্যার! ~ আমি বললাম , যে মিষ্টির নাম বালিশ, সেই মিষ্টি আমি খাই না। আমি লেখক মানুষ! আমার মধ্যে রুচিবোধ আছে। ময়রা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, স্যার, আপনি একটা নাম দিয়ে দেন ! আমার দোকানে এর পর থেকে আমি বালিশ মিষ্টি এই নামে ডাকবো
” নো ফ্রি লাঞ্চ “
” নো ফ্রি লাঞ্চ ” – একটি আমেরিকান বাক্য ! এই বাক্যটা বলে তারা এক ধরনের শ্লাঘা অনুভব করে। তারা সবাইকে জানাতে পছন্দ করে যে তারা কাজের বিনিময়ে খাদ্য বিশ্বাসী। এই ধরনের বাক্য বাংলা ভাষাতেও ও আছে – ” ফেলো কড়ি মাখ তেল “) গায়ে তেল মাখতে হলে কড়ি ফেলতে হবে আরামের বিনিময় মূল্য লাগবে ! যাই হোক নো ফ্রি লাঞ্চের দেশে চিকিৎসা করাতে ব্যাগ ভর্তি ডলার নিয়ে যেতে হবে, এই তথ্য আমি জানি। তবে বিকল্প ব্যবস্থাও আছে ! বুকে প্রচণ্ড ব্যথা বলে যেকোনো হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে। বুকে ব্যথা নামে হার্ট এটাক! হাসপাতাল হেলথ ইন্সুরেঞ্চে আছে কি নেই তা না দেখেই রোগী ভর্তি করাবে। চিকিৎসা শুরু হবে। চিকিৎসার এক পর্যায়ে ধরা পরবে রোগীর হয়েছে ক্যান্সার! হাসপাতাল তখন ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করবে। রোগীকে ধাক্কা দিয়ে হাসপাতালের ফুটপাতে ফেলে দিবে না! চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর বলতে হবে, আমি কপর্দক শুন্য!
বন্ধু বিদায়
৩৭ বছের পূরানো বন্ধু, সুখ ও দুঃখ দিনের সঙ্গিকে বিদায় জানিয়েছি আমাদের বন্ধুত্বকে কেউ সহজভাবে নেয়নি! পারিবারিকভাবে তাকে কুৎসিত অপমান করা হয়েছে। তারপর বন্ধু আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমেরিকায় এসে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে হল। হায়রে আমেরিকা! বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, আমি সিগারেটের বন্ধুর কথা বলছি! ৩৭ বছরের সম্পর্ক এক কথায় কিভাবে বাতিল হল! চিটাগং কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ি। আমাদের বাসা স্কুলের পাশেই নালা পাড়ায়! একদিন স্কুল যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম, বাবা তার সিগারেটের প্যাকেট ভুলে ফেলে গেছেন! প্যাকেটে তিনটা সিগারেট আছে। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে প্যাকেটটি প্যান্টের পকেটে ভরে ফেললাম! রান্নাঘর থেকে দেয়াশলাই নিলাম। স্কুলে গেলাম উত্তেজিত অবস্থায়। ভয়ংকর কোন নিষিদ্ধ কাজ করার আনন্দে তখন শরীর কাপছে!
আমি সিগারেট ধরালাম স্কুলের বাথরুমে। সেটা কখন – ক্লাস চলার সময়ে নাকি টিফিন পিরিয়ড – তা মনে করতে পারছিনা। সস্তা স্টার সিগারেটের (এর চেয়ে দামি কেনার সামর্থ্য বাবার ছিল না) কঠিন ধোয়ায় বালকের কচি ফুসফুস আক্রান্ত হল! আমি বিকট শব্দে কাসছি! হঠাৎ বাথরুমের দরজা খুলে গেলো। বাথরুমের দরজা উত্তেজনার কারনেই বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। স্যারদের রুম ছাত্রদের বাথ রুমের সঙ্গেই। বাইরে থেকে তালা লাগানো থাকে। স্যাররা চাবি নিয়ে আসেন! বড়ুয়া স্যার আমার কানে ধরে হেড স্যারের রুমে নিয়ে গেলেন !
হেড স্যার অবাক হয়ে বলেন “তুই এই বয়সে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ঘুরিস”! তোকে স্কুল থেকে টিসি দিব ! কাল তোর বাবাকে নিয়ে আসবি! আমি বললাম জি আচ্ছা স্যার! হেড স্যার বললেন, তোর বাবাকে আনা দরকার নেই। তোকে টি সি দিয়ে দিচ্ছি!
তিন ডব্লিউ
কোনো নিউ ইয়র্কবাসীকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আবহাওয়া আজ কেমন যাবে? সে হতাশ ভঙ্গিতে বলে তিন ডব্লিউ! তিন ডব্লিউ বিষয়ে কিছু বলা ঈশ্বরের পক্ষে সম্ভব না ! তিন ডব্লিউ হচ্ছে -
১. WOMEN
হা মেয়েদের বিষয়ে কিছু বলা সব দেশের জন্য খুব কঠিন !
২. WORK
কাজ আমেরিকায় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা আসলে ভয়াবহ। অকারন দেশ দখল করে দেউলিয়ার কাছাকাছি। লিবিয়া চলে গেলো। পরবর্তী দেশ কোনটি তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছি!
৩. WEATHER
তিন ডব্লিউ এর শেষটি হল WEATHER ! নিউ ইয়র্কের জন্য এটি সত্য। অক্টোবরে এখানে কখনো বরফ পড়ে না । এই অক্টোবরে বরফ পড়ে একাকার। মানুষ মারা গেছে তিন জন। আমেরিকানের মৃত্যু সহজ কথা না !
উবাস্তে ইয়ামা
উবাস্তে অর্থ ময়লা, ইংরেজিতে গারবেজ! ইয়ামা শব্দের অর্থ পর্বত ! জাপানি এই শব্দ দুটির অর্থ – যে পর্বতে ময়লা ফেলা হয়। প্রাচীন জাপানের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধ পিতামাতাকে লালল পালন করার সামর্থ্য ছিল না! একটা পর্যায়ে তারা পিঠে করে বাবা মাকে নিয়ে পর্বতের খাদে ফেলে দিয়ে আসতো! সবার কাছে এটাই ছিল স্বাভাবিক! পিঠে চড়া বৃদ্ধ পিতা মাতার হাতে গাছের একটি ছোট ডালা থাকতো। এই ডাল দিয়ে তারা পুত্রের গায়ে আস্তে আস্তে বারি দিতো। এই কাজটা তারা কেন করতো পরিস্কার নয়। বলা হয়ে থাকে এই কাজটি তারা করতো যেন পুত্র ফিরে যাওয়ার সময় পথ ভুলে না যায়!
ব্ল্যাক ফ্রাই ডে
শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র একটি দিন। খ্রিস্টানদের রবিবার, ইহুদিদের শনিবার। সপ্তাহের তিন দিন, তিন ধর্মাবম্বিরা নিয়ে বসে আছে! শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলে-ই কি আমেরিকানরা কালো শুক্রবার আবিস্কার করলো? থাঙ্কস গিভিংয়ের রাত থেকেই শুরু এই কালো উৎসব শুক্রবার! একটি দিনের জন্য কম দামে জিনিসপত্র বিক্রির মহোৎসব। ৪০ ইঞ্চি রঙিন টিভি দাম এক হাজার ডলার, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, কালো শুক্রবারে তা বিক্রি হয় ২০০ ডলারে! আমেরিকানরা বড় বড় দোকানের সামনে প্রচণ্ড শীত অগ্রাহ্য করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। কখন রাত ১০টা বাজবে, কখন শুরু হবে কালো শুক্রবার!
(প্রিয় হুমায়ূন স্যারের প্রকাশিত প্রকাশিত লেখা থেকে সংগৃহীত অংশ বিশেষ)
স্যারের আত্মার শান্তি কামনা করছি! নুহাশ, নিশাদ, নিনিত, নোভা , বিপাশা, শিলা, শাওন এবং গুলতেকিনের জন্য রইল সকলের পক্ষ থেকে সমবেদনা এবং শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বাবার দেয়া নাম শামসুর রহমান কাজল বদলে নিজেই রেখেছেন নিজের নাম হুমায়ুন আহমেদ। আজ ১৯ ২০১৩ সাল জুলাই নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী।
সংসার
এক মানুষ জীবনে কতবার সংসার করে? বেশীরভাগ মানুষের জন্য একবার! ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের কারনে বাংলাদেশী মানুষের জন্য দুবার! প্রথম সংসার পুড়ে জ্বলে পুড়ে যাওয়ার কারনে দ্বিতীয় বার। আমি মনে হয় কথা গুছিয়ে বলতে পারছিনা। এখানে সংসার মানে বিয়ে করে ঘর বাঁধা বুঝাচ্ছিনা! হাড়ি কুড়ি, বিছানা বালিশ নিয়ে দিনযাপন বুজাচ্ছি!
আমার মা অতি অল্প বয়সে বাবার সঙ্গে সংসার করতে এসেছিলেন! বাবার মৃত্যুতে মায়ের সংসার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো! তিনি তার বড় ছেলের সঙ্গে ঢাকায় এলেন! নিউমার্কেট থেকে হাঁড়িকুঁড়ি কিনে নতুন সংসার শুরু করলান। আমি বাবাশুন্য মায়ের নতুন সংসারে যুক্ত হলাম!
পড়াশোনার জন্য আমেরিকায় গেলাম। গুলতেকিনকে নিয়ে শুরু হল তৃতীয় সংসার! হাড়ি পাতিল কেনা, বিছানা – বালিশ কেনা!
ঢাকায় ফিরে এসেই সেই সংসার ভাঙল! উত্তরার এক বাসায় শুরু হল আমার চতুর্থ সংসার। বছর তিনেক পর শাওন আমার সঙ্গে যুক্ত হল দখিন হাওয়ায় আমার পঞ্চম সংসার!
ক্যান্সার বাধিয়ে আমেরিকায় এসে শুরু হল ষষ্ঠ সংসার। সম্ভবত, সপ্তম সংসার হবে আমার শেষ সংসার! সেখানে কি আমি একা থাকবো? নাকি সুখ-দুঃখের সব সাথি-ই থাকবে?
দার্শনিক কথা বার্তা থাক, ষষ্ঠ সংসার নিয়ে বলি! বাড়ি ভাড়া করা হল, হাড়ি পাতিল কেনা হল, টি ভি কেনা, বিছানা-বালিশ – সে এক হইচই। তিন রুমের একটি আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি! বাড়িটা নিশ্চয় সুন্দর। কারন, কথাবার্তার এক পর্যায়ে বাড়িতে রোগী দেখতে আসা প্রধানমন্ত্রী বললেন “বাড়িটা কার? ” আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম যেহেতু ভাড়া নিয়েছি, আপাতত আমার !
নিউইয়র্ক এর নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ – বালিশ
আমার জন্ম জেলা নেত্রকোনা ” বালিশ” নামের এক ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়! আকৃতি বালিশের মতোই! এক বালিশ ৭/৮ জনে মিলে খেতে হতে হয়। ~ নেত্রকোনা শহরের মিষ্টির দোকানে বসে আছি ! ময়রা থালায় করে বালিশ এনে আমার সামনে রাখল। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, একটু মুখে দেন স্যার! ~ আমি বললাম , যে মিষ্টির নাম বালিশ, সেই মিষ্টি আমি খাই না। আমি লেখক মানুষ! আমার মধ্যে রুচিবোধ আছে। ময়রা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, স্যার, আপনি একটা নাম দিয়ে দেন ! আমার দোকানে এর পর থেকে আমি বালিশ মিষ্টি এই নামে ডাকবো
” নো ফ্রি লাঞ্চ “
” নো ফ্রি লাঞ্চ ” – একটি আমেরিকান বাক্য ! এই বাক্যটা বলে তারা এক ধরনের শ্লাঘা অনুভব করে। তারা সবাইকে জানাতে পছন্দ করে যে তারা কাজের বিনিময়ে খাদ্য বিশ্বাসী। এই ধরনের বাক্য বাংলা ভাষাতেও ও আছে – ” ফেলো কড়ি মাখ তেল “) গায়ে তেল মাখতে হলে কড়ি ফেলতে হবে আরামের বিনিময় মূল্য লাগবে ! যাই হোক নো ফ্রি লাঞ্চের দেশে চিকিৎসা করাতে ব্যাগ ভর্তি ডলার নিয়ে যেতে হবে, এই তথ্য আমি জানি। তবে বিকল্প ব্যবস্থাও আছে ! বুকে প্রচণ্ড ব্যথা বলে যেকোনো হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে। বুকে ব্যথা নামে হার্ট এটাক! হাসপাতাল হেলথ ইন্সুরেঞ্চে আছে কি নেই তা না দেখেই রোগী ভর্তি করাবে। চিকিৎসা শুরু হবে। চিকিৎসার এক পর্যায়ে ধরা পরবে রোগীর হয়েছে ক্যান্সার! হাসপাতাল তখন ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করবে। রোগীকে ধাক্কা দিয়ে হাসপাতালের ফুটপাতে ফেলে দিবে না! চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর বলতে হবে, আমি কপর্দক শুন্য!
বন্ধু বিদায়
৩৭ বছের পূরানো বন্ধু, সুখ ও দুঃখ দিনের সঙ্গিকে বিদায় জানিয়েছি আমাদের বন্ধুত্বকে কেউ সহজভাবে নেয়নি! পারিবারিকভাবে তাকে কুৎসিত অপমান করা হয়েছে। তারপর বন্ধু আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমেরিকায় এসে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে হল। হায়রে আমেরিকা! বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, আমি সিগারেটের বন্ধুর কথা বলছি! ৩৭ বছরের সম্পর্ক এক কথায় কিভাবে বাতিল হল! চিটাগং কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ি। আমাদের বাসা স্কুলের পাশেই নালা পাড়ায়! একদিন স্কুল যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম, বাবা তার সিগারেটের প্যাকেট ভুলে ফেলে গেছেন! প্যাকেটে তিনটা সিগারেট আছে। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে প্যাকেটটি প্যান্টের পকেটে ভরে ফেললাম! রান্নাঘর থেকে দেয়াশলাই নিলাম। স্কুলে গেলাম উত্তেজিত অবস্থায়। ভয়ংকর কোন নিষিদ্ধ কাজ করার আনন্দে তখন শরীর কাপছে!
আমি সিগারেট ধরালাম স্কুলের বাথরুমে। সেটা কখন – ক্লাস চলার সময়ে নাকি টিফিন পিরিয়ড – তা মনে করতে পারছিনা। সস্তা স্টার সিগারেটের (এর চেয়ে দামি কেনার সামর্থ্য বাবার ছিল না) কঠিন ধোয়ায় বালকের কচি ফুসফুস আক্রান্ত হল! আমি বিকট শব্দে কাসছি! হঠাৎ বাথরুমের দরজা খুলে গেলো। বাথরুমের দরজা উত্তেজনার কারনেই বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। স্যারদের রুম ছাত্রদের বাথ রুমের সঙ্গেই। বাইরে থেকে তালা লাগানো থাকে। স্যাররা চাবি নিয়ে আসেন! বড়ুয়া স্যার আমার কানে ধরে হেড স্যারের রুমে নিয়ে গেলেন !
হেড স্যার অবাক হয়ে বলেন “তুই এই বয়সে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ঘুরিস”! তোকে স্কুল থেকে টিসি দিব ! কাল তোর বাবাকে নিয়ে আসবি! আমি বললাম জি আচ্ছা স্যার! হেড স্যার বললেন, তোর বাবাকে আনা দরকার নেই। তোকে টি সি দিয়ে দিচ্ছি!
তিন ডব্লিউ
কোনো নিউ ইয়র্কবাসীকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আবহাওয়া আজ কেমন যাবে? সে হতাশ ভঙ্গিতে বলে তিন ডব্লিউ! তিন ডব্লিউ বিষয়ে কিছু বলা ঈশ্বরের পক্ষে সম্ভব না ! তিন ডব্লিউ হচ্ছে -
১. WOMEN
হা মেয়েদের বিষয়ে কিছু বলা সব দেশের জন্য খুব কঠিন !
২. WORK
কাজ আমেরিকায় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা আসলে ভয়াবহ। অকারন দেশ দখল করে দেউলিয়ার কাছাকাছি। লিবিয়া চলে গেলো। পরবর্তী দেশ কোনটি তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছি!
৩. WEATHER
তিন ডব্লিউ এর শেষটি হল WEATHER ! নিউ ইয়র্কের জন্য এটি সত্য। অক্টোবরে এখানে কখনো বরফ পড়ে না । এই অক্টোবরে বরফ পড়ে একাকার। মানুষ মারা গেছে তিন জন। আমেরিকানের মৃত্যু সহজ কথা না !
উবাস্তে ইয়ামা
উবাস্তে অর্থ ময়লা, ইংরেজিতে গারবেজ! ইয়ামা শব্দের অর্থ পর্বত ! জাপানি এই শব্দ দুটির অর্থ – যে পর্বতে ময়লা ফেলা হয়। প্রাচীন জাপানের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধ পিতামাতাকে লালল পালন করার সামর্থ্য ছিল না! একটা পর্যায়ে তারা পিঠে করে বাবা মাকে নিয়ে পর্বতের খাদে ফেলে দিয়ে আসতো! সবার কাছে এটাই ছিল স্বাভাবিক! পিঠে চড়া বৃদ্ধ পিতা মাতার হাতে গাছের একটি ছোট ডালা থাকতো। এই ডাল দিয়ে তারা পুত্রের গায়ে আস্তে আস্তে বারি দিতো। এই কাজটা তারা কেন করতো পরিস্কার নয়। বলা হয়ে থাকে এই কাজটি তারা করতো যেন পুত্র ফিরে যাওয়ার সময় পথ ভুলে না যায়!
ব্ল্যাক ফ্রাই ডে
শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র একটি দিন। খ্রিস্টানদের রবিবার, ইহুদিদের শনিবার। সপ্তাহের তিন দিন, তিন ধর্মাবম্বিরা নিয়ে বসে আছে! শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলে-ই কি আমেরিকানরা কালো শুক্রবার আবিস্কার করলো? থাঙ্কস গিভিংয়ের রাত থেকেই শুরু এই কালো উৎসব শুক্রবার! একটি দিনের জন্য কম দামে জিনিসপত্র বিক্রির মহোৎসব। ৪০ ইঞ্চি রঙিন টিভি দাম এক হাজার ডলার, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, কালো শুক্রবারে তা বিক্রি হয় ২০০ ডলারে! আমেরিকানরা বড় বড় দোকানের সামনে প্রচণ্ড শীত অগ্রাহ্য করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। কখন রাত ১০টা বাজবে, কখন শুরু হবে কালো শুক্রবার!
(প্রিয় হুমায়ূন স্যারের প্রকাশিত প্রকাশিত লেখা থেকে সংগৃহীত অংশ বিশেষ)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন