বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৩

মেধাবি ডাক্তারদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে যাচ্ছে

নীলিমার বাসায় নতুন আসবাব কেনা হয়েছে। আমাকে দেখতে যেতে বলেছে কিন্তু সময় করে উঠে  তাই যাওয়া হয়নি। একদিন বান্ধবী ফোন করে বলল “আমার বাসার আসবাবপত্র কেনা তো  তোর জামাইয়ের একদিনের উপার্জণের টাকা তাই তুই আমার বাসায় আসলি না!
রিফা তার ছেলের জন্মদিনে দাওয়াত দিয়েছে যেতে পারিনি তাই রিফা বলল ‌’তুই কি আমাকে এখন আর বান্ধবী ভাবিস! তোর ক্লাস তো এখন অনেক উপরে ! ডাক্তার স্বামী পাইছিস এখন আমরা তোর কাছে কিছুই না তাই বাসায় আসলি না!’
অফিসের সহকর্মীরা গল্পের ছলে জিজ্ঞাসা করেন যখন ‘আপা আপনার স্বামী কি চাকরী করেন?’ উত্তরে আমি যখন বলি, ’স্বামী ডাক্তার’(!) কেউ কেউ বিশ্বাস করতে চায় না, আবার কেউ কেউ অতি আগ্রহী হয় জানার জন্য কোথায় আছেন, দুলাভাই কি রোগের বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি! শেষ কথায় বলেন, আপনি চাকরী করেন কেন? স্বামী ডাক্তার, আপনাদের এতো টাকা খাবে কে? “ ঢাকায় কয়টা জমি কিনলেন, ফ্ল্যাট কিনলেন? সম্পদ কি কি করলেন ইত্যাদি নানা অজানা উত্তর জানতে চান উনারা!
বাড়ি ভাড়া নিতে গেলাম। স্বামী ডাক্তার বলে চোখ ছানা ভরা(!) বাড়ি ভাড়া বেড়ে গেল, সাথে সাথে মালিকের একটা স্বস্তির হাসি। যাক একজন ডাক্তার ভাড়াটিয়া পেলাম!
আমি ডাক্তারের স্ত্রী, অহংকার আমার(!); আর হিংসা অনেকের। আসলে-ই আমি কেমন আছি? কেন হিংসা করছে?
কলেজ জীবন থেকেই স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে কম্পিটার সায়েন্সে। মেডিক্যালও ভর্তি পরীক্ষা দিল। বিশ্ববিদ্যালয়  ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হলেন। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় পঞ্চম হলেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজকেই বেছে নিলেন। পড়াশুনা শুরু করলেন। ৫ বছরের স্থলে ৭ বছরে মেডিক্যাল কলেজ পাশ হল!
ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বিয়ে করলেন; ইন্টার্নি করলেন; এফসিপিএস পার্ট -১; বারডেম হাসপাতাল চাকরী হল; আমাদের ছেলে দুনিয়াতে আসলো; বিসিএস পাশ করলেন; চাকরী নিয়ে গ্রাম আর জেলা শহরে কাটিয়ে; বিভাগীয় পরীক্ষ গুলু পাশ করলেন;  ঢাকায় আগমন এফসিপিএস ফাইনাল পরীক্ষা দিতে; এফসিপিএস ফাইনাল পার্ট মেডিসিনে পাশ করলেন; জেলা শহরে পোস্টিং নিয়ে চলে গেলেন; ফাউন্ডেশন কোর্স করলেন; সহকারী অধ্যাপক হবার সকল যোগ্যতা অর্জন করলেন; আবেদন করলেন; হল না, দলীয়করণেই তলিয়ে গেলেন; অদুর ভবিষ্যতে কবে হবেন জানেনও না।

রোজগার কেমন মাসিক একজন ডাক্তারের?

১০ বছরের চাকরীর অভিজ্ঞতা এবং সকল কোর্স করা শেষ বলে ৩০ হাজার এর কাছাকাছি বেতন পান। যা দিয়ে সৎ ভাবে সুন্দর জীবন যাপন করা অসম্ভব বলব না। কিন্তু সবার চোখে ডাক্তারের জীবন কিংবা নিজের বেড়ে ওঠার জীবনের মতো ও সম্ভব না (!); ফলে ছুটির দিনে ঢাকার বাইরে রোগী দেখতে যান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতি সপ্তাহে। ১০০% সৎ জীবন যাপন করেন। রোগীর সাথে কসাই নয় মানুষের মতো আচরণ করেন তাই সকলের খুব প্রিয় একজন ডাক্তার। ছুটির দিনের আয় মোটামুটি চলে; বর্তমানে এমডি করছেন বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানুষটির জীবনে সাপ্তাহিক কোন ছুটি নেই!
এই ডাক্তারের গাড়ি নেই, বাড়ি নেই, ফ্ল্যাট নেই, ব্যাংকে কাড়ি কাড়ি টাকা নেই। কিন্তু সন্মান ভালোবাসা আছে এক’শ ভাগ। এই ভালোবাসা নামক প্রেম দিয়ে কি আজীবন চলবে? যেখানে একজন নেই সরকার থেকে তাদের  দেয়া হয় না আর কোন সুবিধা !
ঔষধ কোম্পানির কাছ থেকে লোভনীয় অফার থেকে সুবিধা কিংবা ডায়াগনস্টিক থেকে কমিশন খান না। স্যাম্পল ঔষধ স্বজনের মাঝে বিলি করে দেই। অপ্রয়জনীয়গুলু বিক্রি করে ওয়েল ফেয়ার ফান্ড-এ রেখে সাহায্য করি।
আমার কষ্ট নেই, গাড়ি বাড়ি অলঙ্কার নেই, সম্পদ বলতে আছে আমার সততার অহংকার! আমার গর্ব আমার স্বামী সৎ এবং ভদ্র।
সরকারী চাকরী ছেড়ে বেসরকারি হাসপাতাল কাজে যোগদান করলে ভাল বেতন পাওয়া যায়! কিন্তু কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল ডাক্তারদের নীতিটাও কিনে নেন সেই টাকার বিনিময়ে! তাই অনেকেই যোগদানে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন!

বিগত ২৭-০৫-২০১১ সালে দৈনিক প্রথম আলো তে এসেছিল সরকারী চাকরী ছাড়ছেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা শিরোনামে একটি প্রতিবেদন এসেছিল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সরকারি চাকরি ছেড়ে মোটা বেতনে বেসরকারি হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। বেতন ছাড়াও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় তাঁরা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
শুধু ২০১০ সালেই বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ৪৪ জন শিক্ষক চাকরি ছেড়েছেন। গত পাঁচ বছরে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৮ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চাকরি ছাড়ার এই প্রবণতা ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা। ঢাকার বাইরে অন্তত ১০টি জেলায় কথা বলে জানা গেছে, সদর হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শকের কনসালট্যান্ট পদ থাকলেও পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা অপ্রতুল। বেসরকারি হাসপাতালগুলো অনেক বেতন দিয়ে চিকিৎসকদের কিনে নিচ্ছে। বেশি সুবিধা পেলে চিকিৎসকেরা চলে যাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। সমস্যা সমাধানে পেশাজীবী ও সরকার দুই পক্ষেরই স্বার্থ সংরক্ষিত হয়, এমন একটা সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
খুঁজে বের করতে করতে ২০২০ থেকে ৩০২০ সাল চলে আসবে, কিন্তু খুঁজে বের করে সঠিক সমাধান কখনো মিলবে না!
চাকরি ছেড়েছেন, এমন বেশ কয়েকজন চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি ব্যয়বহুল হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা বেশি, এটি সত্য। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে কোনো সরকারই চিকিৎসকদের মেধার গুরুত্ব দেয়নি। বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য হয়ে গেছে। তাই হতাশ ও বাধ্য হয়ে তাঁরা চাকরি ছেড়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা চিকিৎসকদের এই রাজনৈতিক বিভাজনের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলছেন, দলাদলির যে ধারা ২০০০ সালের পর থেকে শুরু হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোয় সহকারী অধ্যাপকের বেতন ২৯ হাজার ৭০০, সহযোগী অধ্যাপকের বেতন ৩১ হাজার ২৫০ থেকে ৩৩ হাজার ৭৫০ এবং অধ্যাপকের বেতন ৩৫ হাজার ৬০০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৫ সালের জাতীয় বেতনকাঠামোয় একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা পেতেন ১৩ হাজার ৯০ টাকা, সেখান থেকে ২০০৯ সালে এই বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৩৭০ টাকা। একইভাবে অধ্যাপকের বেতন ২৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪০ হাজার টাকা হয়। কিন্তু রাজধানীর ল্যাবএইড, স্কয়ার, অ্যাপোলো ও ইউনাইটেড হাসপাতালে কাজ করছেন, এমন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা পাস করেই ৫০ হাজার থেকে দেড় বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করছেন। অধ্যাপকদের কেউ কেউ পাচ্ছেন পাঁচ লাখ টাকারও বেশি বেতন।
কিন্তু সবারই ইচ্ছে হয় স্বপ্ন থাকে সৎ ভাবে একটি সুন্দর ভাল জীবন যাপন করতে। আমার স্বামী ও পারবেন! তবে আমার মাতৃভূমিতে নয়! এবং আমাদের দেশের মেধাবীদের নিয়ে নিচ্ছে উন্নত দেশগুলু খুব সহজেই এবং তারাও যাচ্ছেন, যাবেন ! আমিও যাবো, কারন এখানে জীবনের নিশ্চয়তা নেই আমি বুঝেছি। খাবারে বিষ/ দ্রব্য মূল্য ঊর্ধ্বগতি/ আয় থেকে বেয় বেশী/ সাথে নেই যোগ্যতার প্রাপ্য মর্যাদা !
কিছুদিন আগে একটি দৈনিক এসেছে ডাক্তাররা দেশ ছাড়ছেন! দেশ না ছেড়ে আর কি উপায় আছে কোনো?
সিঙ্গাপুর, মালয়শিয়া, দুবাই, সৌদি আরব, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশগুলোয় বাংলাদেশী ডাক্তারদের অনেক কদর আছে। এবং ওখানে উপার্জনের সাথে জীবনযাত্রার মান অনেক বেশী সাবলীল, সুন্দর ও আনন্দময় !
অস্ট্রেলিয়াতে গাড়ি বাড়ি ইত্যাদি সুবিধা নিয়ে ৮/১০ হাজার ডলার খরচ করলে রাজার হালে জীবন যাপন করতে পারেন একজন বাংলাদেশী ডাক্তার! যার কর্মের সময়ও নির্ধারিত। চাকরী শেষে আলাদা চেম্বার করার কোন দরকার নেই। আছে সাপ্তাহিক ছুটি। এবং মাসিক আয় একজন ডাক্তার ২০/৩০ হাজার ডলার আয় করতে পারেন! বাংলাদেশের একজন ডাক্তার ওখানে ডাক্তার হিসাবে কাজ করতে পাশ করতে একটি পরীক্ষা যেটি আমাদের দেশের এফসিপিএস, এমডি পরীক্ষা পাশ থেকেও সহজ।
আমেরিকাতেও একই অবস্থা। ঘণ্টা প্রতি বললে কমপক্ষে ১০০ ডলার। দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ এবং মাসে যদি ২২ দিন কাজ করা হয় কিংবা ২৬ দিন কাজ করা হয় তবে সেখানেও প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে বসবাস করা যায় যাচ্ছে!
দুবাইতে থাকা খাওয়া বাদেই ৫/৮ লক্ষ টাকা দেয়া হয় বেতন হিসাবে। মালয়শিয়াতে সরকারী চাকরী পেয়ে সহকারী অধ্যাপক হয়েই একজন ডাক্তার বাংলাদেশথেকে যেতে পারেন।
তাহলে ডাক্তাররা সরকারী চাকরী আর দেশ ছেড়ে বিদেশ পাড়ি জমাবেনা কেন? কেনই বা আমি দেশে পচে মরবো? দেশপ্রেম আমি করি বলেই আছি। কিন্তু যাদের উপর দেশপ্রেমের আসল দায়িত্ব বার বার দেয়া হয়েছে হচ্ছে তারা তো বার বার দেশপ্রেমবোধ দেখাতে অসফল হচ্ছেন বলেই দেশের এই বেহাল দশা! সৎ, দক্ষ লোকের মর্যাদা কেড়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক নামক এক অনৈতিক শক্তি!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন